রাতের তারা

 গল্প

রাতের তারা

গল্প, রাতের তারা, বাংলা গল্প, বাংলা সাহিত্য, গুম, story, bangla story


০১


জিডি করে কোন লাভ হবে না জেনেও রহমান সাহেকে থানায় আসতে হয়েছে অনেকটা রাহেলা বেগমের পীড়াপীড়িতে। তিন দিন ধরে ছেলেটাকে খুজে পাওয়া যাচ্ছে না, অন্তত এ রেকর্ডটুকু থানার খাতায় থাকুক। এ কারনে রহমান সাহেবের থানায় আগমন। এ ক’দিনে পরিচিত যত আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধব আছে সবখানে খোঁজ করা হয়েছে। মেডিকেল হাসপাতালগুলোও বাদ যায়নি। কিন্তু কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না।


মঙ্গলবার সকালে যথারীতি ভার্সিটির প্রস্তুতি নিয়ে বাসা থেকে বেড়িয়েছে। কিন্তু সেদিন ছিল ভার্সিটি বন্ধ। আম্মু জিজ্ঞেস করাতে বলল ডিপার্টমেন্টে চুল্লি নিয়ে কি একটা কাজ আছে তাই ভার্সিটিতে যেতে হবে। আম্মু তাই কোনো বাধা দেয়নি।


০২


পুলিশ অফিসারটিকে খুব বেশি ভদ্র মনে হলো না। তাচ্ছিল্যের সঙ্গে কান খোঁচাতে খোঁচাতে জিজ্ঞেস করলো— ‘নাম কী?’


একবার মনে হলো রহমান সাহেব চটে যাবেন অবশ্য অন্যসময় ঠিকই চটে যেতেন। কিন্তু তিনি চটলেন না। এ মুহূর্তে মাথা ঠান্ডা রাখা উত্তম। তাই তিনি যতটা সম্ভব মাথা ঠান্ডা রেখেই বললেন,


—অনি, সাইদুর রহমান অনি।


—কবে চলে গেছে?


—চলে যায়নি, পাওয়া যাচ্ছে না


—ঐ একই হলো, বয়স কতো?


—বিশ বছর


—পড়নে কি ছিলো?


—নেভি ব্লু টি-শার্ট, জিন্স, সাথে কলেজ ব্যাগ।


—কোনো ছবি আছে?


—এই নিন, আমি সাথেই নিয়ে এসেছি।


-আপনার তো ভালো বুদ্ধি আছে দেখছি, এখনও মাথা ঠান্ডা আছে। হু’ দেখতে ভালই মনে হচ্ছে। প্রেম ট্রেম করতো নাকি? আজকালের ছেলেপেলেরা কখন কী করে তা কী কেউ খবর রাখে!




রহমান সাহেব চটলেন না, শান্ত মুখে বসে রইলেন। অফিসারটি মুখ তুলে চাইলেন,


—দেখি আমরা কতো দূর করতে পারি। আপনি আপনার নাম্বারটা রেখে যান, আমরা যোগাযোগ করবো।


০৩


থানা থেকে বের হয়ে যেনো হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। থানা জিনিসটাকে তিনি যমের মতো ভয় করেন। তারপরও থানায় আসতে হলো। ছেলেটার জন্যে সত্যিই খুব খারাপ লাগছে। তারপরও শক্ত আছেন তিনি। তিনি দূর্বল হয়ে পড়লে রাহেলাও যে ভেঙে পরবে।


কড়া নাড়ার শব্দে দরজা খুললেন রাহেলা। চোখে তখনও অশ্রুর চিহ্ন। উন্মুখ হয়ে চেয়ে আছেন স্বামীর দিকে। কিন্তু স্বামীর মুখে কোনো উত্তর নেই।


ঘরে আরও কিছু চাপা চাহনি।


অনির পিঠাপিঠি বোনটা রেলিঙে দাড়িয়ে; যদি ভাইয়াকে দেখা যায়। অনির ছবিটা ধরে ডুঁকরে ডুঁকরে কাঁদছে।

০৪


দিনের আলো অনেক আগেই নিভে গেছে। ল্যামপোস্টের বাতিগুলো জলছিল। রাত যতো গভীর হচ্ছিলো রাস্তাঘাট ততোই ফাঁকা হচ্ছে। ঘরের প্রত্যেকটা মানুষ তখনও সজাগ। অনির কোনো সন্ধান নেই।


হঠাৎ লোড শেডিং। আলো জ্বালানোর কোনো তাগিদ নেই কারও মাঝে।


গেটের কাছে মাইক্রোবাসের ব্রেক কষার শব্দে কান সজাগ হলো। ভায়েরা দৌড়ে কোন বারান্দায় গেলো। কী যেনো মাইক্রোবাস থেকে রাস্তায় গড়িয়ে পড়লো আর শাঁ শাঁ করে মাইক্রোবাসটা চলে গেলো। দাড়োয়ানের চিৎকারে সবাই নিচে নেমে এলো। বস্তার মুখ খুলতেই হাত পা বাধা অনির লাশ।


নির্বাক চাহনি নিয়ে সবকটা মুখ তাকিয়ে রইল রাতের অন্ধকার আকাশে। সেখানে জ্বল জ্বল করে একটা তারা জ্বলছে।

Post a Comment

0 Comments