শিল্পের বিমূর্ততা

 শিল্পের বিমূর্ততা

চিত্রকলা, বাংলা চিত্রকলা, বাংলাদেশের চিত্রকলা, চিত্রকলার ইতিহাস, Art, Bangla Art Histry, Art Histry, বিমূর্ততা, শিল্পের বিমূর্ততা, চিত্রকলার বিমূর্ততা, Abstractness, Abstractness in art, Abstract painting, Abstractionism


কিছুকথা

‘বিমূর্ত শিল্প’ শব্দটাকে কেন্দ্র করে ইদানিং শিল্পশিক্ষার্থী ও শিল্প রসিক উভয়ের মধ্যে কিছু ভুলবোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে তাই বিষয়টিকে নিয়ে আধুনিক দৃষ্টিকোন থেকে কিছু বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা করা আবশ্যক। তাতে করে নিরসন হতে পারে তথাকথিত সংশয় ও ভ্রান্তি


মূর্ত কী বিমূর্ত কী?

বাস্তব সত্য যা তা-ই মূর্ত। বহির্জগতে আমরা যা অবলোকন করি,, নিজস্ব ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য,স্পর্শে যাকে চেনার – জানার চেষ্টা করি তা-ই মূর্ত। মূর্ত যা  চির পরিচিত এবং ধরাছোয়ার মধ্যে। এক শিখলে যেমন প্রশ্ন জাগে তারপর কী? দুই তারপর? তিন। তেমনি স্পর্শের পর কী? অনুভব। তারপর?  বিশ^াস তারপর? নিজস্ব সত্ত¡া। নীতি নৈতিকতা, অদম্য ভালোলাগা আমার কাছে তাই বিমূর্ততা। হার্বাট রিডের ভাষায়,‘‘সমস্ত র্শিপই প্রাথমিকভাবে বিমূর্ত। এ হল জড়বস্তুর অনিশ্চয়তা যা প্রাণের ছন্দলাভে উন্মুখ।’’

ছবির চেয়ে মূর্তি যেমন অনেক বেশি মূর্ত তেমনি মূর্তের চেয়ে বিমূর্ততা অনেক বেশি মূর্ত। 


প্রত্যেক যুগেই সৃষ্টিশীল শিল্পীরা যার যার যুগের চরিত্রকে সুন্দরভাবে ধারণ করে সৃষ্টি করেছেন। কোনো ক্ষেত্রে শিল্প প্রকরণ ও বিষয়বস্তু ও শিল্পভাব জন্ম দিয়েছে নতুন ধারার; নতুন আন্দোলনের। এ সৃষ্টির ভেতর দিয়েই আমরা স্পর্শ করতে চেয়েছি শিল্পের নানা অনুষঙ্গ। যার মধ্যে সবচেয়ে মেধা ও পরিপূর্ণ চিত্রকলা বিষয়ক বিষয় ‘বিমূর্ততা’ বা এবস্ট্রাকশন। বিমূর্ততা সীমাহীন Ñ অনন্ত অসীম। বিমূর্ততা একটি স্বতস্ফূর্ত অপরিকল্পিত অবস্থান। একটি সাময়িক স্থানিক নির্মাণ। সেখানে দৃশ্যমান পরিকল্পিত বাস্তবতাকে অস্বীকার। বাস্তবতা ক্ষমতার স্বার্থ উদ্দেশ্য ও প্রয়োজন অনুযায়ী আকারপ্রাপ্ত বহিরাগত। বিমূর্ততায় কল্পিত বাস্তবতার তাৎক্ষণিক নির্মাণ ও বিসর্জন। বিমূর্ততা এক স্বাধীন অবস্থান। এর নির্মাণে কোনো প্রকাশিত বিধি এবং বিধান নেই। বিমূর্ততা অসীম এক ধারণা মাত্র।


প্রশ্ন যেখানে অস্তিত্বের

বিমূর্ত বিষয় এমন একটি বস্তুকে বুঝায় যার কোনো আকার নেই, অবস্থান নেই এবং হয়তো কোনো নির্দিষ্ট সময়ের গন্ডিতে তাকে বাঁধা যায় না। কিন্তু বস্তুর সজ্ঞাতো আমরা এর উল্টোটা জানি। যে বস্তুকে আমরা প্রত্যক্ষ করি না সে তো কল্পলোকের বস্তু। আর কল্পনার বস্তুও সবসময় মূর্তিহীন হয় না। মূর্তিহীন কল্পনার বস্তু তেকে থাকেই তাহলে সেই বস্তুর স্বরূপ যদি খুঁজি তাহলে আমরা বিমূর্ত বস্তুর অস্তিত্ব খুঁজে পাই। বিমূর্ত বস্তুর অস্তিত্ব আছে কথাটির অর্থ হলো মন নিরপেক্ষ অস্তিত্ব তার আছে। আর দর্শনে প্রাচীনকাল থেকেই বিমূর্ত বস্তুর অস্তিত্ব স্বীকার করে আসছে। আধুনিক শিল্পকলা যখন বিমূর্ত, তখন তা সত্যই অনেকের কাছে দূর্বোধ্য এবং বিষয়টি গভীর এবং সূ²। সাধারণ মানুষ যেখানে গাচ, পাথর, ঘর-বাড়ী, ঘোড়া-মোষ, সুন্দর মুখ খোঁজেন শিল্পবোদ্ধা তা খোঁজেন না। শিল্পবোধ সম্পন্ন মানুষ হতে হলে যে শিক্ষার দরকার তার ছোয়া সবাই পায় না। যে কারণে সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ছে।


বিমূর্তকলা ও নন্দনতত্ত্ব

শিল্পের শিল্পবোধ ও মূল্যবোধের তিনটি স্তর আছে: যা মূলত মানুষের অগ্রচিন্তার প্রতিফলনকে সামগ্রিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। সত্য শিব সুন্দর - এ তিনটি ধারাই মানুষের মূল্যবোধের প্রধানতম প্রতীক। সৌন্দর্য একটি বিমূর্ত ও অতিন্দ্রীয় বিষয়। মানুষ সেই সৌন্দর্য অনুভূতিকে প্রকাশ করে লেখায়, সঙ্গীতে, চিত্রকলায়, অভিনয়ে কিংবা চলচিত্রে।


নন্দনতাত্তি¡ক রূপকল্প বুদ্ধিগত ধারণার উপর নির্ভরশীল নয়। আবার বুদ্ধিগত জ্ঞান নন্দনতাত্তি¡ক জ্ঞানের উপর নির্ভর না করে থাকতে পারে না। শিল্প ও বিজ্ঞানের মধ্যে তফাৎ থাকলেও উভয়ের মধ্যে একটা যোগসূত্র আছে। বৈজ্ঞানিক সত্যের অনুধাবনে আমরা এতই মগ্ন থাকি যে বৈজ্ঞানিক কর্মের নন্দনতাত্তি¡ক দিকটুকু আমাদের কাছে অলক্ষ্য থেকে যায়। যখন কাব্যের বিষয়বস্তু পাঠককুলের চিত্ত আচ্ছন্ন করে, তখন কাব্যের প্রকাশটুকুই সব। পদ্য এবং গদ্য যেমন শিল্প ও বিজ্ঞান তেমন। পদ্য হলো অনুভূতির ভাষা, গদ্য হলো বুদ্ধির ভাষা। বুদ্ধির মধ্যে অনুভূতি আছে অনুস্যুত বলেই বৌদ্ধিক ক্রিয়াকর্মের সত্যটুকু আমরা অনুভব করি।


শিল্পপ্রক্রিয়া আপাতদৃষ্টিতে সংশ্লেষণ বা সমন্বয়ধর্মী হলেও এর বিশ্লেষণী বৃত্তিই প্রধান বৌদ্ধিক প্রক্রিয়া। মুহূর্তের অভিজ্ঞতাকে মেধা ও মনন, প্রজ্ঞা ও অর্জিত অভিজ্ঞতা ইত্যাদির আলোকে বিশ্লেষণ করেন। শিল্পীর সৃষ্টিতে শুধুই কল্পনা থাকে না,  তাঁর অভিজ্ঞতা ও প্রতিভার স্পর্শ তাতে থাকতেই হবে। শিল্পের দীর্ঘদিনের ইতিহাসে রূচি ও রস , শিল্পবৈশিষ্ট্য ও গুণ ইত্যাদির নিরিখে একটি ন্যূনতম ংঃধহফধৎফ আপনা থেকেই নির্ধারিত হয়ে গেছে। 


শিল্পের অন্বিষ্ট যে সত্য সেই দৃষ্টিকোণ থেকে শিল্পবিচার করলে আরেকটি জিজ্ঞাসা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। তা হলো এই সত্যের স্বরূপ কি? অনেকে বলেন শিল্পসত্য হচ্ছে শিল্পকর্মের সুসঙ্গতি, সামঞ্জস্য এবং তার অর্জিত পূর্ণ-রূপ। আবার কেউ কেউ বলেন শিল্পসত্য ও জীবনসত্য এক জিনিস। অর্থাৎ শিল্পবিচারে শিল্পবস্তু জীবনকে কতখানি গভীরভাবেপ্রকাশ করেছে তাই দেখতে হবে। শিল্পের বিচারে সত্যের স্বরূপ উদঘাটনের যে আয়োজন চলে কীটসের ‘শিল্পসত্যই জীবনসত্য’ উক্তিটি তারই একটি গূঢ় প্রকাশ।


যখন কোন কর্ম সফল হয় তখন আমরা যে বিশেষণগুলো ব্যবহার করি তারা হলো সুন্দর। কুৎসিত হলো বিফল প্রকাশ কর্ম। নন্দনতাত্তি¡ক ক্রিয়াকর্ম সুন্দর এবং অসুন্দর বোধের দ্ব›দ্ব এবং বৈপরীত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। যখন জটিল প্রকাশ ক্রমে সরলতম প্রকাশ কর্মকে অবলম্ভন করে তখনই ঐ দ্ব›েদ্বর অবসান ঘটে। এর ফলে যে ভ্রান্তি ঘটে তার মূলে এমন কতকগুলো প্রকাশ তাকে সুন্দর বা কুৎসিত কিছুই বলা যাবে না। কেননা কুৎসিত দিকটারও একটা নন্দনতাত্তি¡ক দিক রয়েছে।


বিমূর্ত মনস্তাত্বিক বিশ্লেষণ

আমরা একটি বস্তুকে অনুভব করি, দেখার সঙ্গে তাকে যদি অনুভব করতে না শিখি তাহলে কিছুই দেখা হলো না। সুতরাং আমরা একটি বস্তুকে দেখব অনুভব করব চিহ্নিত করব এবং প্রকাশ করব। বস্তুর একটা নিজস্ব সত্ত¡া আছে। যে স্বত্ত¡া তার বস্তুগত অস্তিত্ব। শিল্পী সেই অস্তিত্ত¡ অনুভব করেন ছন্দায়িত রঙের ক্যানভাসে। বস্তু কোনো প্রতিপাদ্য বিষয় নয়, প্রতিপাদ্য বিষয় বস্তু ও সজীবতাকে উপলব্ধি করা। সেজন্য প্রয়োজন বোধ-অনুভূতি-দৃষ্টি-নান্দনিকতা ও দর্শন। উপলব্ধি আর জানা অজানার বিশ্লেষণের মাধ্যমের ভেতর দিয়েই আমরা খুঁজে পাই বিতর্কতার সড়ক। তৈরি হয় নানামূখী শব্দ। সৃষ্টি হয় ব্যকরণহীন ব্যকরণ। আর এটাই বিমূর্ততা। এটা কোনো একক কোনো বিষয়ের উপর নির্ভর করে গড়ে উঠে নি। যার নিয়ন্ত্রিত স্থায়ী কোনো ব্যাখ্যা নেই বিশ্লেষণ নেই। নিয়মভিত্তিক কোনো ছকে আটা যাবে না। কিন্তুকে হৃদয়কে ছুঁয়ে যাবে। অন্তর জাগিয়ে তুলবে। নতুন একটা ভাবনার স্পেস দিবে।


বিমূর্তবাদ

টুকরোর টুকরো অবলোকন ও বিশ্লেষণ যতই সুষ্ঠুভাবে করা হোক না কেন তা থেকে কোনো সর্বাত্মক কোনো সিদ্ধান্তে আসা দূরুহ। বিশাল একটা সময় ব্যবধানে একদল শিল্পী সৃষ্টিকে প্রভাবিত করে, সুনির্দিষ্ট কিছু পার্থক্য সৃষ্টি করে পূর্বসূরীদের সাথে নির্নিত হয় আঙ্গিক, শৈলি, শিল্প প্রকরণ এবং বিষয়বস্তুর ও শিল্পভাব সকল ক্ষেত্রে , তখনই জন্ম নেয় নতুন একটা শিল্প ধারার। ভাববাদ Ñ প্রতীকবাদ . . . পরাবাস্তববাদ . . . বাস্তববাদ . .  তারপর বিমূর্তবাদ।


বিমূর্ত চিত্র

শিল্প সৃষ্টিতে বিমূর্ততা সবসময় ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। কারণ শিল্পের জন্মলগ্ন থেকে বিষয়টা জড়িত। কল্পনা ও বিমূর্ত ধারনাÑ এর মূলে রয়েছে বস্তুজগৎ ও বাস্তবতা। দৃশ্যমান বস্তুজগতের উৎস থেকে সৃষ্ট বিমূর্ত আইডিয়াকে শিল্পী তার শিল্পকর্মে মূর্ত রূপ দিয়ে চলেছে। রূপ যতই মূর্ত হোক, সেখানে কিছুটা বিমূর্ততা থাকবেই। কোন শিল্পীর পক্ষে একশ ভাগ মূর্ত রূপ সৃষ্টি করা সম্ভব নয়।


চিত্রকে ভেঙেচুড়ে নতুন করে বিন্যাসের মাধ্যমে আমরা মূর্ত বিমূর্ততাকে বুঝিয়ে থাকি সত্যিকার অর্থে বিমূর্ততা তার চেয়ে অধিক কিছ্ ুএকটা হচ্ছে বাহ্যিক অবয়ব আর একটা হচ্ছে নান্দনিকতা দুয়ে মিলে বিমূর্ততার ক্যানভাস আঙ্গিককে আশ্রয় করে শিল্পী তার অন্তরের উত্তাপ দিয়ে সৃষ্টি করে শিল্পস্বার্থে প্রত্যেকটা শিল্পই বিমূর্ত। সত্যিকার অর্থে বিমূর্ততা জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে আমাদের জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে। বিমূর্ততা আমাদের জীবনেরই চিত্র। প্রত্যেটাঁ শিল্পের মূল শিকড়ই এই বিমূর্তায়নে। বিমূর্ত ধারনাই ধাপে ধাপে মূর্ত হয়ে উঠে। আর এ প্রক্রিয়ায় প্রত্যেকটা ধাপে কিছু না কিছু বিমূর্ততা থেকে যায়। বিমূর্তের প্রথম অনুরণন দেখা যায় ইম্প্রেসনিস্টদের চিত্রে।


বারবারা হেপওয়র্থ অনুভূতির অ-সাধারণ গভীরতা ও সহানুভূতি নিয়ে এক বিমূর্ত পর্যায় ভেদ করে আবির্ভূত হয়েছেন। তিনি বিশুদ্ধ গড়নের শিল্পচর্চা থেকে সরে আসেন নি। তার চিত্রের কৌশল শক্তি ও সূ²তা মহৎ শুদ্ধতার এমন এক পর্যায়ে পৌছেছে যে যা মুধু বিমূর্ত রূপসচেতন শিল্পীদের কাছেই ধরা দেয়। ইতালীয় শিল্পীরা স্থাপত্যে বিমূর্ত শৈল্পিকতা সম্পর্কে খুবই সচেতন ছিলেন। বিমূর্ত শিল্প তার নিজ অধিকারেই বেঁচে থাকে। বারবারা হেপওয়র্থ বলতেন,‘বিমূর্তধারায় কাজ করলে তা আমাদের ব্যাক্তিত্বকে যেন মুক্ত করে, উপলব্ধিকে আরও তীক্ষè করে, যাতে জীবনের পর্যবেক্ষণে সেই পরিপূর্ণতা আসে।’’


বিমূর্ত ছবির মিল্পীদের একটি প্রধান প্রবণতা আকার-অবয়বের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। সব অনুষঙ্গের বিলি-বন্টনে একটা ক্ষমতা সৃষ্টি হরো কিনা এ বিষয়ে খুবই ভাবিত নিরাবয়বী শিল্পীরা। মানুষের মনের গতিবিধি গাণিতিক সমাধানে আঁকা যায় না। তাই বিমূর্ত ছবির দুয়েকটি বিষয় আনন্দ, কষ্ট, বিষাদ, সুন্দর এসবের স্মারক হয়ে উঠে। বস্তুবাদ ও ভাববাদ পরস্পরকে বিচ্ছিন্ন করে কিছু ঘঁটানো সম্ভব নয়। কিছু গড়ে তোলাও সম্ভব নয়। কারণ বাস্তব বিমূর্ততা পরস্পরকে জড়িয়ে রাখে। কিংবা বিমূর্ততাই বাস্তব এবং সত্য।


ক্যানদিনিস্কি (১৮১৬-১৯২৪) তার প্রথম বিমূর্ত চিত্র এঁকেছিলেন ১৯১০ সালে। মিল্পীর ব্যাক্তিত্বে বা আত্মচেতনার প্রতিফলনই তার চিত্রে ভেসে উঠেছিল। অভিব্যাক্তিবাদেরই এর উত্তরাধিকার তার বিমূর্ততা। এই বিমূর্ত অভিব্যাক্তিবাদকে তিনি নাম দিয়েছিলেন ‘ধার্ট অব্ অ্যান ইন্টার্নাল ন্যাসেসিটি।’ প্রাকৃতিক বাস্তবতা তেকে চিত্রের প্রতিমা পর্যন্ত রুপান্তরকে ক্যানদিনিস্কি তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন যার শেষ স্তরটিতে এসে বাস্তবতার প্রতীক ভাষা সম্পূর্ণই শিল্পীর ব্যাক্তিত্বে নিরপেক্ষ হয়ে যাচ্ছে। আর নিরপেক্ষ ও নৈব্যাক্তিক নিরিখের সন্ধানই বিমূর্ততার পরম লক্ষ্য।

বিমূর্ততা ও বাংলাদেশ

বাংলাদেশে বিমূর্ত শিল্পের আবির্ভাব ঘটে পঞ্চাশের দশকের শেষপ্রান্তে। ষাটের দশক থেকে এ চিত্রশৈলী নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় আজ অনেক রকম বৈশিষ্ট্য পেয়েছে বিমূর্ত বা নির্বন্তক যে নামেই ডাকা হোক না কেন এ ধারার শিল্পকর্মকে তাতে সময়, প্রকৃতি, একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক ও কাল খন্ডে সীমায়িত। চিত্রকলার মৌল অনুষঙ্গে রচিত হয়েও একজন রথকো বা একজন সুলাজের কাজের সঙ্গে বাংলাদেশের কিবরিয়া বা বাসেতের ভিন্নতা সহজেই শনাক্ত করা যায়। প্রকৃতিলগ্ন হয়ে থাকা আর সুউচ্চ দালান সৌধের নগর অরণ্যে বসে জীবন-অভিজ্ঞতা, এ দুয়ের মধ্যে তারতম্য অনেক। এই তারতম্য মনে রেখে বাংলাদেশের বিমূর্ত চিত্রকলা পাঠ করতে গেলে শিল্পীর ভাবনা ও নির্মাণের স্বাতন্ত্র্য চোখে পড়ে। প্রাকৃতিক অনুষঙ্গ বাদ দিয়ে শুধু শুদ্ধ জ্যামিতিক কাঠামোর সহযোগিতায় বিমূর্ত চিত্রকলা কখনোই প্রাণ পায় না। এদেশের শিল্পীরা শুদ্ধ জ্যামিতিক গড়ন সংগ্রহ করেছেন এদেশের লোককলার বিন্যাস থেকে। কেউ আবার লোকশিল্পের সংগঠন  ও শুদ্ধ জ্যামিতিক সংগঠনের মধ্যে ঐক্য খুঁজতে চেয়েছেন। বাংলাদেশে বিমূর্ত চিত্রকলায় যার নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয় তিনি হচ্ছেন শিল্পী মাহমুদুল হক। শিল্প সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই তিনি লোককলার বিপরীতে থাকতে চেয়েছেন। রেখা, বুনট, গড়ন, বর্ণছোপ এইসব অনুষঙ্গ জোড়া দিয়ে নিজের মনোলোক উদ্ভাসিত করেছেন।


জাতীয়তাবাদকে জাগ্রত করে বিমূর্ততা

শিল্পের বিভিন্ন ধারা দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতি ও সাংস্কৃতিক আবহাওয়ায় বেগ পেয়েছে ইউরোপ ছাপিয়ে চলে এসেছে নিজেদের আঙ্গিনায়। যদিও শিল্প সার্বজনীন। সর্বকালের সব মানুষের সব জাতির জন্য শিল্প। তাই আলাদা করে জাতীয়তাবাদের প্রসঙ্গ টানা অযৌক্তিক। এই বিরোধ সত্তে¡ও জাতীয়তাবাদের বিশ^জনীনতা বনাম আমাদের স্বাতন্ত্র্যের ব্যবধান ঘুচে। জাতীয়তাবাদী বিমূর্ততার মধ্যে রয়েছে সার্বজনীনতার দুটি স্তর। একটি বিশ^জনীন সার্বজনীনতা, অপরটি জাতীয়ক্ষেত্রের সার্বজনীনতা। বিশ^জনীন সার্বজনীনতা গড়ে উঠে ‘সার্বজনীন’ ইতিহাস, বিজ্ঞান ও কারিগরী এবং প্রতিষ্ঠানসমূহের ধ্যানধারণা থেকে। দর্শন, গণিত, বিজ্ঞান, চিত্রকলা, ভাষা, সাহিত্য, সমাজ, রাজনীতি সর্বত্র চলছে এই প্রক্রিয়া। অন্য এক প্রক্রিয়ায় জাতীয়তাবাদ ‘জাতীয়’ ক্ষেত্রের সার্বজনীনতা, যা তার অস্তিত্বের প্রধান যুক্তিপ্রদায়িনী গড়ে তোলে এবং অন্য জাতীয়তার বিপরীতে স্থাপন করেÑ অর্থাৎ এখানে দুটি স্তরে বিমূর্ততা ক্রিয়া করে। একটি ‘জাতীয় আত্ম’- এর স্তর এবং অন্যটি ‘অপর জাতীয়তা’র স্তর। এক্সেত্রে জাতীয়তাবাদ একটি বা কয়েকটি সাংস্কৃতিক বা রাজনেতিক উপাদান বেছে নিয়ে একটি জনসমাজের সমস্ত অংশের ওপর বিমূর্তাভাবে প্রয়োগ করে। জন্ম দেয় বিমূর্ত সত্ত্বার। একটি ‘আমরা’ ও ‘ধামাদের’ সত্ত্বার এবং ‘তারা’ বা ‘তাদের’ সত্ত্বার। বস্তুত ‘তারা’ আছে বলেই বিপরীতে ‘আমরা’ আছি। বিমূর্ততা শব্দটি যতই গম্ভীর দার্শনিক শোনাক না কেন আমাদের জীবনের সর্বস্তরে চলছে তার নিরন্তর ব্যবহার। একটু অন্যভাবে বললে - ‘বিমূর্তায়নের হাত থেকে আমাদের নিস্কৃতি নেই।


উৎসঃ

শিল্প চেতনা— নির্মাল্য নাগ

শিল্পের সারার্থ— হারবার্ট রিড

ইউরোপের ইতিহাস—ক্ষেত্র মিত্র

বাংলাদেশের চিত্রশিল্প— মইনুদ্দীন খালেদ

বিমূর্ততা শিল্প সাহিত্য চিত্রকলায়— মাহবুব কামরান

বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা


আরো পড়ুন:

বাংলা চিত্রকলার ক্রমবিকাশ ও বাংলাদেশ

চিত্রকলা : পাকিস্তান পর্ব ও ৭১ পূর্ব বাংলাদেশ

Post a Comment

0 Comments